শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২০

বস্তার



উন্নয়নের রথের চাকায় পৃষ্ট হয়ে,
বস্তারের আদীবাসীরা পালিয়ে বাঁচে,
ছেড়ে দেয়,জঙ্গলের অধিকার।
'অপারেশন  গ্রীন্ট হান্টের অত্যাচারে'
ধর্ষিতা হতে হতে ভূমি সন্তানেরা হারিয়ে যায়,
বস্তারের পোড়া গন্ধের ধংসস্তূপের অন্তরালে।

পুঁজিপতি, শিল্পপতিদের বিকৃত লালসার শিকারে,
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অগুনে,
একে একে পুড়ে ধুলিসাৎ হয়ে যায়,
আধিবাসীদের মান,মর্যাদা, ইজ্জত,........
''সালওয়া জুড়ুম' আর মাওবাদী ধরার অভিযানে,
বস্তারবাসী আতঙ্কে কাঁদে, তাদের সর্বনাশে।
সিঙ্গুর,নন্দীগ্রাম,লালগড়,নেতাই,
গুজরাত,জম্মু-কাশ্মীর, বস্তার.....
হাড় হিম করা সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা,
রক্ত দিয়ে লেখা থাকবেই সন্ত্রাসের ইতিহাসে।

মোমবাতিওয়ালা প্রতিবাদী  কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে,
মরচে ধরে মাটিতে মিশে যায়,
রক্তলোলু্প কাপুরুষজনোচিত হিংস্রতার ভয়ে.....
'আমরা পিঁপড়ের গর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ি'।
সন্ত্রাসের রথের চাকা গড়িয়ে চলে,
অনন্তকাল ধরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
বস্তারবাসী পড়ে থাকে সেই বস্তারেই
দু:খের অনলে পুড়ে অন্তরে অন্তরে।

তারা আজ অন্যায়,অত্যাচারে জর্জরিত, 
সাঁড়াশি চাঁপে লাঞ্ছনা,বঞ্চনার শিকার
আমরা কি কখনোও ফিরিয়ে দিতে পারি? 
বস্তারের আদিবাসীদের অরন্যের অধিকার। 



(প্রতিভা পত্রিকায় প্রকাশিত)

ভদ্রলোকটি



চৈত্র ,বৈশাখের তীব্র দাবদাহের আগুনে পুড়ে ছাই মন,
    পেঠের আগুন জ্বলে দ্বিগুণ, 
              চোখে ভেসে উঠে সরষে ফুল ।
জ্বলে না শুধু একটি পোড়া হৃদয় ।
      শোভা বর্ধন করে অভুক্ত শরীর, 
                 কঙ্কালসার পাঁজরের পদ্মফুল।

সূর্যকে মাথায় ধরে, হাতে ভাঙা থালা , 
  অর্ধ নগ্ন শরীরে সেই হাজার বছরের পুরোনো,
          ময়লা, তৈলাক্ত ছেঁড়া জামা ।
কোটরগত চোখ দুটো মনে হয় একমাত্র জীবিত ,
  ছলছল নয়নে,মৃদু স্বরে ডাক দিয়ে যায়
     ও দাদা,  ও দিদি....
          একটি টাকা আমায় দাওনা ?

চলন্ত গাড়ির মতো সবাই চলে যায়, 
   পাশ কাটিয়ে, না দেখার ভান করে, 
            স্কুল,কলেজ, অফিস, আদালতে।
  কাজ - কর্ম সম্পাদন করে সকলেই যায় ফিরে ,
      ব্যস্ততম পৃথিবীর আপন আপন ঘরে ।

দুর্ঘটনায় দুই পা হারানো ভদ্রলোক টি
     প্রতিদিন বসেই থাকে, রাস্তার পাশে মাটি কামড়ে ,
তৈলাক্ত ছেঁড়া জামা, আর ভাঙা থালা ,
      ভালোবেসে, শুধু  যায় না তাকে ছেড়ে।

মাথার ঘাম মুছে ফেলে, ভদ্রলোক টি,
    আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে বলে, 
মানুষ আজ বড়ই স্বার্থপর, দয়ার নাই লেশ,
        আর কত দিন বুকের আগুন জ্বলবে ?
সভ্য সমাজের অমানবিক অত্যাচার, 
  নীরবে নিভৃতে সহ্য করে, আমি একদিন হবো নিঃশেষ ।



(আলোর দিশা,পত্রিকায় প্রকাশিত)


বুকের পাটা


যে যাই বলুক ভাই, 
   নেতা, মন্ত্রী, এমপি, দালালদের 
          সমালোচনা করতে গেলে ,
                   বুকের পাটা চাই। 

সমাজ থেকে শোষন  নির্মূল
   করতে গেলে,অন্যায়ের বিরুদ্ধে
             প্রতিবাদ করতে গেলে,
                   সাম্যের সমাজ গড়তে হলে,
                           বুকের পাটা চাই।

স্বার্থপর সুবিধাবাদী মানুষ
    আজ কিববিল করছে ,
        নিজের নিজের আখের গুছিয়ে
                  ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা ভরছে।
অনাহারে মরছে মানুষ,
    কেউ দেখার নাই।
       সত্যি বলছি ভাই, 
          গরীবের কথা বলতে গেলে, 
                 সর্বহারাদের নিয়ে লড়তে হলে
                         বুকের পাটা চাই।

ভোটের সময় হাজার হাজার
     প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, 
          নেতাদের স্বভাবই এই
             ভোট নিয়েই কেটে পড়ি।
আমরা কোটি টাকার ইমারত গড়ি।
    একটু ভেবে দেখুন ভাই, 
      সাম্যের সমাজ গড়তে হলেও
           আমাদের বুকের পাটা চাই ।



বাল্য বন্ধু



বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া
এক বাল্য বন্ধুকে খুঁজে পেলাম সেদিন,
মেদনীপুর রেলওয়ে প্লাটফর্মে।
উস্কো খুস্ক চুল,মুখভর্তি অবহেলিত দাড়ি। 
বহুকাল থেকে ক্ষুধার্ত, ক্লান্তিজনিত শরীর,
মনে নেই,তার নিজেরই ঠিকানা বাড়ি।
পরনে ছেঁড়া জামা,তৈলাক্ত প্যান্ট,
খালি দুটো ময়লা পা,চটি জুতো ছাড়া।

ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখি.....
শান্ত,নম্র,ভদ্র,মেধাবী ছেলেটা
কি করে হলো এমন ছন্নছাড়া।
বসন্তের এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে
লেগেছিল, প্রানে তার প্রেমের হাওয়া।
কত আশা,কত স্বপ্ন,হৃদয়ে জমা,
আকুতি, মিনতি শেষে হাতে পায়ে পড়া,
তবুও বাবা, মা সেদিন করেনি তাকে ক্ষমা।
অপমানে রাগে, দু:খে অভিমানে
চোখের জল মুছতে মুছতে হতভাগা
পাড়ি দেয় নিরুদ্দেশে.....
সেই দিন থেকেই হল ঘরছাড়া। 
তারপর জেগেছে কত বিনিদ্র রাত,
ক্ষুধার অনলে কেটেছে কত নিরম্বু উপবাস। 
ভাবি জীবনসাথি, বসন্তের কোকিল
সেও দিল ফাঁকি,ডুবল তরী,হারাল দুই কূল।

সেদিন প্লাটফর্ম জুড়ে লোকারণ্য,
কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরে বললাম তাকে
কীরে?কেমন আছিস ওরে ভাই?
বড়ো,বড়ো চোখ দুটি করে ছল্ ছল্
বোধ হয়,আমাকে চিনতে পেরে,
বিড় বিড় সুরে বলে যায়,আপনার মনে,
"এই অসভ্য সমাজে বাঁচতে চাই না আমি...
দাদা,আমাকে ভুলে যাও দয়া করে।"

০৭/০৩/২০১৭

নায্য দাবী



দেশের রক্তচোষা,স্বৈরাচারী শাসকদের
চোখ রাঙানি সহ্য করতে করতে,
    শরীরের প্রতিটি কোষেই 
       তৈরি হয়েছে অ্যান্টিবডি। 
আমরা কারো ভয়ে ভীত নয়,
   যে রঙেরই থাকুক না সরকার। 
শাসকের চোখের উপর চোখ রেখে 
       নির্ভীক কন্ঠে বলে দিতে পারি------
         দিতেই হবে আমাদের নায্য অধিকার।

আমরা পশু নই, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব
    আমাদের চাই,অন্ন-বস্ত্র-উপযুক্ত বাসস্থান।
      ------এ আমাদের নায্য দাবী,
         কারো দয়ার দান নয়।
ক্ষুধিত, অভুক্ত, অসহায়
  মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে,
   মহান গণতান্ত্রিক দেশের
    নেতা,মন্ত্রী, দালালদের,
      প্রাসাদোপম ঘর বাড়ি তৈরী হয়।

গরিবের বুকের পাঁজরের উপর গড়ে ওঠে,
  একের পর এক সপিংমল,মাল্টিসেক্টর।
যারা গরীব, খেটে খাওয়া শ্রমিক,
      আছে শুধু তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার,
ভোট ভীখারিরা মনসদে বসেই,
   ভুলে যায়,তাদের প্রতিশ্রুতির কথা
      নায্য দাবী মানার চেয়ে------
         জনগনের উপর চালায় অন্যায়-অবিচার।
শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে হলেও
   আমরা ছিনিয়ে নেবই আমাদের নায্য অধিকার। 
     আমাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের অসীম শক্তি,
        দেশের কি না কাজ করতে পারে?
         জনগণের হাতে কত ক্ষমতা জানে না তারা?
         দরকারে আমরা ভাঙতে পারি গড়তে পারি সরকার।

দেশের আইন মাকড়সার জাল



আমাদের দেশের এক আজব কাণ্ড কারখানা, 
যারা শ্রমিকের টুঁটি চিঁপে হত্যা করে,
তাদেরকেই আমরা মাথায় তুলে নাচি, 
দু হাত তুলে কীর্তন করি, গাহি জয়গান-----
খাল কেটে নিজেরাই কুমির ছানা আনি।
নেতাদের কথায় উঠি, আবার বসি, 
হায়! কত না আমারা নির্বোধ? 
বাবুদের নির্দেশ মান্য করে চলি।

নেতাদের জন্য রাজকীয়, এলাহি ব্যাপার, 
সাথে আবার এয়ার কাণ্ডিশেন গাড়ি।
আমারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে
ফসল ফলায়,দেশের সভ্যতা গড়ি।
তবুও বাবুরা দেই না উপযুক্ত দাম।
সরকার জারি করে নতুন নতুন ফরমান----
গরীব কে মারার নিত্য নতুন ফন্দি ফিকির!
বন্ধু,সারা দেশে ছড়িয়ে আছে তার প্রমান ।

যারা এক মুঠো ভাতের জন্য চুরি করে,
তারা দেশের আইনে জেলে পচে মরে।
আর যারা গরীবের তাজা রক্ত চুষে,
দেশের কোটি কোটি টাকা চুরি করে, 
তারাই আবার দেশের সরকার গড়ে।
আমাদের দেশের আইন মাকড়সার জাল, 
সেই জালে রাঘর বোয়ালরা ধরা পড়ে না
চুনো পুঁটিরা সহজেই আটকে পড়ে।
বিজয়মাল্যরা জাল ছিঁড়ে বিদেশ পালায়,
তবে,মাকড়সার জাল সর্বহারাদের মারণ ফাঁদ।
গরীবের মাথায় হাত বুলিয়েই দেখো ভাই, 
 দেশের নেতা,মন্ত্রীরা পাই স্বর্গের স্বাদ।